× ই-পেপার প্রচ্ছদ সর্বশেষ বাংলাদেশ রাজনীতি দেশজুড়ে বিশ্বজুড়ে বাণিজ্য খেলা বিনোদন মতামত চাকরি শিক্ষা আজকের কার্টুন ফিচার সকল বিভাগ ছবি ভিডিও লেখক আর্কাইভ কনভার্টার

বিলুপ্তির পথে তামা, কাঁসা ও পিতলের তৈজসপত্র

নিয়ন দুলাল

প্রকাশ : ২৩ জুলাই ২০২৫ ১৫:০১ পিএম

বিলুপ্তির পথে তামা, কাঁসা  ও পিতলের তৈজসপত্র

বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক গৌরবময় অধ্যায় ছিল তামা, কাঁসা ও পিতলের তৈজসপত্র। রান্নাবান্না, পরিবেশন, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান কিংবা পানীয় সংরক্ষণ- প্রতিটি ঘরোয়া প্রয়োজনে এসব ধাতব পণ্যের ব্যবহার ছিল অবিচ্ছেদ্য। দেশের অন্যান্য জেলার মতো লালমনিরহাটেও এসব তৈজসপত্র একসময় ছিল প্রতিটি ঘরের নিত্যসঙ্গী। তবে আধুনিকতা ও সস্তা বিকল্প পণ্যের চাপে আজ বিলুপ্তির পথে এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প।

বর্তমানে অনেক সনাতন ধর্মাবলম্বীরা এখনও কাঁসার থালায় খাবার পরিবেশন আতিথেয়তার একটা অংশ মনে করেন। তামা, কাঁসার জিনিসপত্রের মধ্যে কাস্তেশ্বরী, রাজভোগী, রাঁধাকান্তি, বংগী, বেতমুড়ি, রাজেশ্বরী, রত্নবিলাস, ঘুটা ও কলতুলা নামে রয়েছে থালা ও গ্লাস। কৃষ্ণচূড়া, ময়ূরকণ্ঠী, ময়ূর আঁধার, মলিকা ইত্যাদি নামে পাওয়া যায় জগ। রাজভোগী, জলতরঙ্গ, রামভোগী, গোলবাটি, কাজলবাটি, ঝিনাইবাটি, ফুলতুলিবাটি ইত্যাদি নাম রয়েছে বাটির নাম। বোয়ালমুখী, চন্দ্রমুখী, চাপিলামুখী, পঞ্চমুখী, ঝিনাইমুখী নামে রয়েছে চামচ। এ ছাড়া নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুই তামা, কাঁসা ও পিতলের পাওয়া যায়। পূজা-অর্চনায় মঙ্গল প্রদীপ, কোসাকুর্ষি, মঙ্গলঘট ইত্যাদি কাঁসার বাদ্যযন্ত্র উল্লেখযোগ্য।

ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, উপমহাদেশে তামা, কাঁসা ও পিতলের ব্যবহার মোগল আমলের বহু আগেই শুরু হয়- এই শিল্পের রয়েছে হাজার বছরের প্রাচীন ইতিহাস। তবে মোগল শাসনামলে (১৫০০-১৮০০ খ্রিস্টাব্দ) এই শিল্পে নান্দনিকতা, কারুকার্য ও বহুমুখী ব্যবহারে বৈপ্লবিক উন্নতি ঘটে। সেসময় এই ধাতুগুলো দিয়ে তৈরি হতো অস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও নিত্যপ্রয়োজনীয় উপকরণ। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসনামলে এই শিল্প আরও প্রসার লাভ করে এবং বাংলার ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়ে কাঁসা-পিতলের হাঁড়ি-পাতিল, থালা-বাটি, সুরাই, প্রদীপ ও পূজার মঙ্গলঘট। কারুকার্যখচিত এসব তৈজসপত্র হয়ে ওঠে রুচি, সৌন্দর্য ও শৌখিনতার প্রতীক।

বাংলাদেশে এই শিল্পের প্রধান উৎপাদন কেন্দ্র ছিল ঢাকা জেলার ধামরাই। এখান থেকেই এর বিস্তার শুরু হয়, যা ধীরে ধীরে আশপাশের জেলাগুলোয়ও ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু আজ এই ঐতিহ্য ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, এর পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। প্রথমত, প্লাস্টিক, মেলামাইন ও স্টিলের মতো সস্তা ও সহজলভ্য বিকল্প বাজার দখল করে নিয়েছে। দ্বিতীয়ত, দক্ষ কারিগরের অভাব। নতুন প্রজন্মের মধ্যে আগ্রহ কমে যাওয়ায় কারিগর সংকট দিন দিন বাড়ছে। তৃতীয়ত, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার অভাব। ঐতিহ্য রক্ষায় নেই কোনো কার্যকর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। চতুর্থত, তামার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের সংকট উৎপাদনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। সবশেষে বাজারজাতকরণের দুর্বলতা। আধুনিক বিপণন ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদিত পণ্য বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না।

লালমনিরহাটের বাজারগুলো ঘুরে দেখা গেছে, এখনও হাতে গোনা কিছু দোকানে কাঁসা-পিতলের পণ্য বিক্রি হচ্ছে, তবে দোকানগুলোতে ক্রেতাদের দেখা অনেকটা কমই মিলে। একসময় যেখানে জমজমাট ব্যবসা ছিল কালীবাড়ি, পুরান বাজার, বিডিআর রোড, রেলওয়ে বাজার এলাকায়, আজ সেখানে সুনসান নীরবতা। কয়েকটি দোকান ঘুরে আরও জানা যায়, বর্তমানে দেব-দেবীর বড় আকারের একটি মূর্তির মূল্য ১-৩ লাখ টাকা পর্যন্ত। মূলত আকার অনুযায়ী এই মূর্তিগুলোর দাম নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া রাধাকৃষ্ণের মূর্তি ৫০ থেকে ৮০ হাজার টাকা। বিভিন্ন জিনিসের মধ্যে একেকটির দাম একেক রকম। এই দোকানগুলোতে ১৫০-২০০ টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকা দামের জিনিসও পাওয়া যায়। আবার অনেক সময় ক্রেতা তাদের পছন্দ অনুযায়ী পণ্যের অর্ডার করলে ব্যবসায়ীরা তা সংগ্রহ করে নিয়ে আসেন।

সাংবাদিক বিপুল ইসলাম বলেন, বাঙালির সংস্কৃতির গৌরবময় অধ্যায় ছিল তামা, কাঁসা ও পিতলের তৈজসপত্র। মোগল শাসনামলে এই শিল্পে নান্দনিকতা ও বৈচিত্র্য যুক্ত হয়, ব্রিটিশ আমলে তা আরও বিস্তৃত হয় বাংলার ঘরে ঘরে। তবে আধুনিকতা ও সস্তা বিকল্প পণ্যের কারণে আজ এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প বিলুপ্তির পথে।

জেলা সদরের বড়বাড়ী হাটের ব্যবসায়ী জ্ঞানেন্দ্র নাথ রায় বলেন, ‘আগে অনুষ্ঠানে উপহার হিসেবেও কাঁসা-পিতলের জিনিসের কদর ছিল। হিন্দু-মুসলমান সবাই কিনতেন। এখন তেমন বিক্রি নেই।’

একজন প্রবীণ ক্রেতা চন্দ্র ঠাকুর বলেন, ‘পারিবারিক রীতির কারণে এখনও কিছু কিনতে হয়। তবে দাম বেশি হওয়ায় এগুলো কেনা এখন দায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা ছাড়া বাসায় রাখলে চুরি হওয়ার ভয়ও রয়েছে ‘

‘গৌর নিতাই ভান্ডার’-এর তত্ত্বাবধায়ক বিপ্লব রায় জানান, গত ১৫ বছরে কাঁসা-পিতলের দাম বেড়েছে ১৪ গুণ। ফলে বাজার প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।

শহরের কালিবাড়ী এলাকার তামা-কাঁসার ব্যবসায়ী তাপস রঞ্জন বণিক জানান, একসময় এটি আমাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ছিল। এখন ক্রেতা নেই, মানুষ শুধু সস্তা পণ্যের দিকেই ঝুঁকছে। অথচ তামা-কাঁসার পাত্রে খাওয়া-পান শরীরের জন্য উপকারীÑ এমন বিশ্বাস আগে ছিল।

রংপুর পুলিশ লাইন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও সংস্কৃতি গবেষক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, বাঙালির সংস্কৃতি ও জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত এই শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। মূল্যবৃদ্ধি ও সস্তা বিকল্পের কারণে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। এই ঐতিহ্যকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে দরকার আধুনিকায়ন, সুলভ মূল্য ও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা।

কাঁসা ও পিতলের ব্যবসায়ীদের মতে, এই শিল্প টিকিয়ে রাখতে হলে প্রয়োজন মূল্য কমানো ও সরকারি নীতিগত সহায়তা, সেই সঙ্গে যারা এই অন্যগুলো উৎপাদন করে তাদেরকে স্বল্প সুদে সহজ শর্তে ব্যাংকঋণ এবং দক্ষ কারিগর তৈরির প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণ। তা না হলে হয়তো সময়ের পরিবর্তনে ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে পারে বাঙালির শতাব্দী প্রাচীন এই গৌরবময় ঐতিহ্য।


শেয়ার করুন-

মন্তব্য করুন

Protidiner Bangladesh

সম্পাদক : মারুফ কামাল খান

প্রকাশক : কাউসার আহমেদ অপু

রংধনু কর্পোরেট, ক- ২৭১ (১০ম তলা) ব্লক-সি, প্রগতি সরণি, কুড়িল (বিশ্বরোড) ঢাকা -১২২৯

যোগাযোগ

প্রধান কার্যালয়: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৬৯৬ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (প্রিন্ট): +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮১০, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০ | ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন (অনলাইন): +৮৮০১৮৮০৭৪৪৫৮০, +৮৮০১৭৯৯৪৪৯৫৫৯ । ই-মেইল: [email protected]

সার্কুলেশন: +৮৮০৯৬১১৬৭৭৮০৭, +৮৮০১৮৮০৭৪৪৩৩২ । ই-মেইল: [email protected]

বিজ্ঞাপন মূল্য তালিকা